প্রতীকী ছবি।
লাই চিং তে তাইওয়ানে ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছেন। তিনি পেয়েছেন ৪০ শতাংশ ভোট, যা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হোউ ই ইহের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি। হোউ ছিলেন কুয়োমিন্টাং (কেমমটি) দলের প্রার্থী। লাই স্বশাসিত দ্বীপটির বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার এই জয়ের মধ্য দিয়ে মূলত চীনবিরোধী অংশটি শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তার নির্বাচনে সাফল্যের মূলে ছিল বিরোধী শিবিরে বিভক্তি। কেএমটি ও নবগঠিত তাইওয়ান পিপলস পার্টি যৌথভাবে প্রার্থী দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দল দুটি একক প্রার্থী ঠিক করতে পারেনি।২০০০ সালের পর এই প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেয়ে জয়ী হলেন। তার ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) স্বশাসিত দ্বীপটিতে ১৯৯৬ সাল থেকে ক্ষমতায় আছে। ঐ বছর দ্বীপটিতে প্রথম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়েছিল। বলা প্রয়োজন ডিপিপি বা কেএমটি কোনো দলই চীনের মূলখণ্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়া সমর্থন করে না। তবে কেএমটি ডিপিপির চেয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার পক্ষপাতী।
লাই ডিপিপির মধ্যে একজন স্বাধীনতাপন্থি হিসেবে পরিচিত। তবে তিনি বলেছেন, যেহেতু তাইওয়ান স্বাধীন দেশের মতোই সবকিছু করছে তাই তাদের বিশেষভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করার দরকার নাই। তিনি চান চীনের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক বা স্ট্যাটাস কিউ বজায় থাকুক। গত বছর জুলাইতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা চীনের শত্রু হতে চাই না, আমরা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চাই।’ যাই হোক, তিনি এমন এক অবস্থানে আছেন, তার পক্ষে বেইজিংকে তুষ্ট করা সম্ভবনা নাই। তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছেন হসিও বিখিমকে, যিনি ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রে দ্বীপটির প্রতিনিধি ছিলেন। সঙ্গত কারণেই বিষয়টি চীনের জন্য স্বস্তিকর নয়। তাইওয়ানের নির্বাচন নিয়ে বেইজিং এখনো কঠিন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিনন্দন জ্ঞাপনের সমালোচনা করলেও নির্বাচন নিয়ে কিছু বলেনি। এর কারণ হতে পারে অভ্যন্তরীণ ইস্যু, যেমন অর্থনীতি। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। তাইওয়ানের নির্বাচন বেইজিংয়ের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।তাইওয়ানের সাধারণ মানুষ কাকে ভোট দিল তারচেয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে কতটা হস্তক্ষেপ করছে সেটাই চীনের দেখার বিষয়। এটা ঠিক যে, ডিপিপির চেয়ে কেএমটির সঙ্গে কাজ করতে বেইজিং বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। তবে তার অর্থ এই নয় যে, তাইওয়ান চীনের সঙ্গে যুক্ত হবে। তাইওয়ানে দীর্ঘদিন চীনবিরোধীরা ক্ষমতায়, ব্যক্তির রদবদল দলের রদবদল নয়, এবং তারা চীনের সঙ্গে বড় কোনো বিবাদেও জড়াচ্ছে না।

তাইওয়ানে নির্বাচনের পর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে প্রশান্ত মহাসগরীয় দ্বীপ নাউরুতে। দেশটি তাইপের ওপর স্বীকৃতি উঠিয়ে ফের একচীন নীতিতে ফেরার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে বহির্বিশ্বে তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা দেশের সংখ্যা ১২ তে নেমে এলো। তাইওয়ানের নির্বাচন বেইজিংয়ের জন্য সুখবর না হলেও এটি নাউরুর সিদ্ধান্ত চীনকে যেমন উজ্জীবিত করবে, তেমন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনকে কিছুটা হলেও হতাশ করবে। নির্বাচনের বছর হওয়ায় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল রিপাবলিকানরা একে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করতে পারে। গত দুবছর ধরে ওয়াশিংটন বলে এসেছিল যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলো বাইডেনের পেছনে রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নাউরুতে অষ্ট্রেলিয়ার একটি অভিবাসী আটক কেন্দ্র ছিল। সেটি বন্ধ করে দেওয়ায় দেশটি আর্থিক চাপে আছে। যে কারণে বেইজিংয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া লাই চিংকে আরো যেসব দেশ অভিনন্দন জানিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইন। ম্যানিলার এই পদক্ষেপে স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ফিলিপাইন আগুন নিয়ে খেলছে যার পরিণতি ভালো হবে না। পশ্চিমা অন্যসব দেশের প্রতি চীন যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তার তুলনায় একে অনেক কড়া বলতে হবে। অনেকে মনে করেন, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বেইজিংকে তাইওয়ানের বিষয়ে কঠিন প্রতিক্রিয়া দিতে উদ্বুদ্ধ করে। বাস্তবে তাইওয়ান চীনের প্রতি সেরকম বৈরী মনোভাব পোষণ করে না। গত বছর চীনের রপ্তানি ১৫ শতাংশ পড়ে গেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অথবা মন্থর প্রবৃদ্ধি যে কোনো কারণেই হোক এটা হয়েছে। তাইওয়ানে কে ক্ষমতায় যাচ্ছে তার চেয়ে অর্থনৈতিক বিষয় এখন বেইজিংয়ের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইত্তেফাক/এএইচপি